চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ সক্ষমতা

নির্মাণ খাতের মন্দা ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যয়ের মুখে ফ্লোট গ্লাস শিল্প

দেশে ফ্লোট গ্লাস শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণে গ্লাসের ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে উদ্যোক্তারা একের পর এক নতুন বিনিয়োগ করেছেন।

বিদ্যমান কারখানাগুলোও বাড়িয়েছে উৎপাদন সক্ষমতা। কিন্তু বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজারের চাহিদা বাড়েনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণ খাতে মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদহার বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে ফ্লোট গ্লাসের চাহিদা কমেছে। ফলে বর্তমানে এ শিল্পে যে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, তা স্থানীয় বাজারের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

চাহিদা ও সক্ষমতার এ বড় ব্যবধান শিল্পটির জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারখানার বড় একটি অংশের সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় স্থায়ী ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফার্নেসনির্ভর এ শিল্পে উৎপাদন প্রক্রিয়া একবার চালু করার পর তা নিয়মিতভাবে সচল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শুধু উৎপাদন কমে যায় না, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বেড়ে যায়।

দেশে ফ্লোট গ্লাসের বাজার গড়ে ওঠার শুরুতে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত ছিল। নির্মাণ খাতের সম্প্রসারণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ দেখে উদ্যোক্তারা বড় অংকের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসেন। এক পর্যায়ে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এরপরও নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকে।

বাংলাদেশের কাচ শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকের গোড়ায়। ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে রাষ্ট্রায়ত্ত উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় এবং ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনে যায়। দীর্ঘ সময় এটিই ছিল দেশের শিল্পভিত্তিক কাচ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে দেশে নির্মাণকাজ ও নগরায়ণ বাড়তে থাকায় কাচের চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাত কাচ উৎপাদনে আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৯৭ সালে এমইবি গ্লাস শিট গ্লাস উৎপাদনে আসে। তবে এ সময়ও দেশের কাচের বাজারের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর ছিল।

দেশের কাচশিল্পে বড় পরিবর্তন আসে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন আধুনিক ফ্লোট গ্লাসের স্থানীয় উৎপাদন শুরু হয়। ২০০৫ সালে পিএইচপি গ্রুপ ও নাসির গ্রুপ স্থানীয়ভাবে ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে আসে। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশে আধুনিক গ্লাস উৎপাদনের একটি নতুন শিল্পভিত্তি তৈরি হয়। নির্মাণ, আবাসন ও নগরায়ণের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে ফ্লোট গ্লাসের বাজারও দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় অংকের বিনিয়োগ শুরু করেন।

পরবর্তী এক দশকে নির্মাণ ও আবাসন খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেশের কাচ শিল্পে নতুন বিনিয়োগের গতি বাড়িয়ে দেয়। বহুতল ভবন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা, শিল্প-কারখানা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে কাচের ব্যবহার বাড়তে থাকায় ফ্লোট গ্লাসের চাহিদাও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। এ সময় বড় উৎপাদকরা বিদ্যমান কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। একই সঙ্গে সাধারণ ফ্লোট গ্লাসের বাইরে টেম্পার্ড, রিফ্লেক্টিভ, সাউন্ডপ্রুফসহ বিভিন্ন ধরনের মূল্য সংযোজনকারী গ্লাস উৎপাদনেও বিনিয়োগ শুরু হয়।

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষে শিল্পটির কাঠামোতে আরো পরিবর্তন দেখা যায়। নতুন উদ্যোক্তারা বড় অংকের বিনিয়োগ নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে শুরু করেন। ২০২৪ সালে আকিজ বশির গ্রুপ হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বড় আকারের একটি গ্লাস কারখানা স্থাপন করে। দৈনিক প্রায় ৬০০ টন উৎপাদন সক্ষমতার এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের গ্লাস শিল্পে আরো বড় উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হয়। মেঘনা গ্রুপ এ খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। ফলে সামনে গ্লাস উৎপাদন সক্ষমতা আরো বাড়বে।

গ্লাস তৈরির মূল কাঁচামাল হলো সিলিকা বালি। এর সঙ্গে সোডা অ্যাশ, ডলোমাইট, চুনাপাথর ও সল্ট কেক উচ্চ তাপে গ্লাস উৎপাদন করা হয়। দেশে বর্তমানে গ্লাসের চাহিদা বার্ষিক ৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা ১০ লাখ টন। কাচ তৈরির মূল উপাদান সিলিকা বালির স্থানীয় সহজলভ্যতার বিষয়টিও এ শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। তবে এ শিল্পে ব্যবহৃত অন্যান্য বেশকিছু কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিবেশের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে বালি উত্তোলন বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে বালির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যা এ খাতের উৎপাদকের ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের সময় দেশের অর্থনীতি, নগরায়ণ ও নির্মাণ খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্মাণ খাতের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে যে বাজার সম্প্রসারণের প্রত্যাশায় নতুন সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, সেটি বাস্তবে পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। ২০১৮-১৯ সালের দিকে দেশে ফ্লোট গ্লাসের বাজারে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্তও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সে সময় ফ্লোট গ্লাসের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছিল এবং এ কারণে পাঁচ বছরের মধ্যে এটি দ্বিগুণ হবে এমন সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে কভিডের পর নির্মাণ খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধীরগতি দেখা দেয়। এর ফলে বাজারে যে ধরনের ত্বরিত প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হয়েছিল সেটি আর হয়নি। আগের তুলনায় গ্লাসের বাজারের প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে। এখন ফ্লোট গ্লাসের বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি আছে—এমনটা বলা কঠিন। বরং বাজারের চাহিদা কমে এখন এর প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগের আগে উদ্যোক্তা যে ধরনের উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছিলেন, সেটি বাস্তবে কাজ করেনি। এতে এ শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আবাসন ও ব্যক্তিগত নির্মাণে বিনিয়োগ কমেছে। একই সময়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ডেভেলপার ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের খরচও বেড়েছে। ফলে নতুন ভবন, আবাসিক প্রকল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের গতি কমেছে। নির্মাণ খাতের এ ধীরগতি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে ফ্লোট গ্লাসের বাজারে।

ফ্লোট গ্লাস শিল্পের বড় দুর্বলতা হলো এর বাজারের একটি বড় অংশ নির্মাণ খাতনির্ভর। ভবনের জানালা, দরজা, ফ্যাসাড, পার্টিশন, শপফ্রন্টসহ বিভিন্ন কাজে ফ্লোট গ্লাস ব্যবহৃত হয়। ফলে আবাসন ও বাণিজ্যিক নির্মাণে বিনিয়োগ কমলে গ্লাসের চাহিদাও দ্রুত কমে যায়। বিশেষ করে বড় প্রকল্পের নির্মাণকাজ পিছিয়ে গেলে গ্লাসের অর্ডারেও তার প্রভাব পড়ে। একটি প্রকল্পের নির্মাণ কয়েক মাস বা এক বছর পিছিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট সময়ে গ্লাসের চাহিদাও তৈরি হয় না। একইভাবে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কমে গেলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার ঘাটতি তৈরি হয়।

এ অবস্থায় শিল্পটির বিকাশের জন্য শুধু নতুন কারখানা স্থাপন নয়, গ্লাসের ব্যবহার বাড়ানোর নতুন বাজার তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উচ্চ মূল্যের প্রক্রিয়াজাত গ্লাস, এনার্জি-এফিশিয়েন্ট গ্লাস, টেম্পার্ড ও লেমিনেটেড গ্লাসের মতো মূল্য সংযোজিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে একই উৎপাদন সক্ষমতা থেকে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব হতে পারে।

ফ্লোট গ্লাস শিল্প মূলত উচ্চ তাপমাত্রায় পরিচালিত ফার্নেসনির্ভর। এ কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ এ শিল্পের অন্যতম প্রধান উৎপাদন উপকরণ। অন্য অনেক শিল্পের মতো ফ্লোট গ্লাস কারখানা প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন চালু ও বন্ধ করতে পারে না। ফার্নেসের ধারাবাহিক কার্যক্রম বজায় রাখা উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, সরবরাহে অনিয়ম এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদনকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যায় রয়েছেন। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। আবার জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন পরিকল্পনাও ব্যাহত হয়।

গ্লাস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (জিএমইএবি) প্রেসিডেন্ট ও নাসির ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের গ্লাস শিল্পে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশে রফতানি আরো বাড়ানো সম্ভব হলে এ অব্যবহৃত সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাবে। বর্তমানে এ শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে কারখানায় ফার্নেস চালু রাখাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফার্নেস একবার চালু করা হলে সেটি ১০ বছর চালু রাখতে হয়। আর যদি কোনো কারণে বন্ধ করতে হয়, সেক্ষেত্রে এটি পুনরায় চালুর জন্য এক থেকে দুই বছর সময় লাগে এবং এজন্য দেড়শ থেকে দুইশ কোটি টাকা ব্যয় হয়। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল কিংবা ফার্নেস অয়েলের মাধ্যমে এটি চালু রাখা যায়। কিন্তু এতে খরচ অনেক বেশি পড়ে আর যে পরিমাণ তেল প্রয়োজন হবে, সেটির সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন। তাই গ্লাস শিল্পকে অন্যান্য শিল্পের মতো না দেখে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দেশে বর্তমানে যে কয়েকটি গ্লাস কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি নিশ্চিতের জন্য একটি নীতিমালা থাকা দরকার।’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন কমলেও কারখানার স্থায়ী ব্যয় একই হারে কমে না। ঋণের সুদ, কর্মীদের বেতন, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ চালিয়ে যেতে হয়। ফলে সক্ষমতা ব্যবহারের হার কমে গেলে প্রতি ইউনিট গ্লাসের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি কাঁচামাল ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর উপকরণের মূল্যও শিল্পটির ওপর চাপ তৈরি করছে। ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের পরিবর্তন উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি উৎপাদনকারীদের আর্থিক ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে একদিকে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়ায় পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

শিল্পটির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বিদ্যমান সক্ষমতার কতটা বাস্তবে ব্যবহার হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক গুণ বেশি হলে বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার স্বাভাবিক সম্ভাবনা থাকে। উৎপাদকরা বাজার ধরে রাখতে মূল্যছাড় বা তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রির পথে গেলে তাদের মুনাফা আরো কমতে পারে। অন্যদিকে সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকলেও কারখানা পরিচালনার স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কম সক্ষমতা ব্যবহারের কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সূচক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বাজারে বিদ্যমান সক্ষমতা পর্যাপ্ত হওয়ার পরও নতুন কারখানা বা বড় ধরনের সম্প্রসারণ হলে সরবরাহ-চাহিদার ব্যবধান আরো বাড়তে পারে। এতে পুরো শিল্পের ওপর মূল্য ও মুনাফার চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ফ্লোট গ্লাস শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এ খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণনির্ভর বিনিয়োগ রয়েছে। একটি ফ্লোট গ্লাস কারখানা স্থাপনে বড় অংকের মূলধন প্রয়োজন হওয়ায় উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ঋণের পাশাপাশি কার্যকরী মূলধন ঋণের ওপরও নির্ভর করতে হয়। চাহিদা দুর্বল থাকা অবস্থায় বিক্রি কমে গেলে প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ কমে যায়। অথচ ব্যাংকের ঋণের সুদ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যয় নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চলতে থাকলে ঋণ পরিশোধে চাপ তৈরি হতে পারে।

এ কারণে ফ্লোট গ্লাস শিল্পে অতিরিক্ত সক্ষমতা শুধু উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি নয়, অর্থায়নকারী ব্যাংকের জন্যও ক্রেডিট রিস্ক তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পের ঋণের পরিমাণ বড় এবং সক্ষমতা ব্যবহারের হার কম, সেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু গ্লাস নয়, সব শিল্পের ওপরে পড়ছে। এতে করে অনেক ভালো ঋণগ্রহীতাও বর্তমানে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

গ্লাস শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠান নাসির গ্লাসে বিনিয়োগ রয়েছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক পিএলসির। ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে জানান, ‘গ্লাস উৎপাদনে গ্যাস একটি অপরিহার্য উপাদান। এ কারণে গ্যাসের সংকট হলে তার বিরূপ প্রভাব গ্লাস উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর পড়বে, এটিই স্বাভাবিক। গ্লাস ছাড়াও প্রায় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই গ্যাসের প্রয়োজন হয়। তাই গ্যাস ছাড়া আমাদের অর্থনীতি চলবে না। সরকারকে গ্যাস সংকটের দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধান বের করতে হবে।’

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এ মুহূর্তে ফ্লোট গ্লাস শিল্পের জন্য শুধু মোট উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। বরং কারখানাগুলোর সক্ষমতা ব্যবহারের হার, বিক্রয় প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয়, গড় বিক্রয়মূল্য, নগদ প্রবাহ এবং ব্যাংক ঋণের পরিমাণ—এসব সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ কোনো শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকা নিজেই সমস্যা নয়, যদি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দীর্ঘ সময় ধরে সক্ষমতা ব্যবহারের হার কম থাকে এবং নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত থাকে। তখন অতিরিক্ত সক্ষমতা শিল্পের সম্পদে পরিণত হওয়ার বদলে আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।

ফ্লোট গ্লাস শিল্পের সামনে সম্ভাবনাও রয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও নির্মাণ খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি হলে গ্লাসের চাহিদা বাড়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের বাইরে রফতানির সুযোগ তৈরি করা গেলে অতিরিক্ত সক্ষমতা ব্যবহারের নতুন ক্ষেত্র পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ ফ্লোট গ্লাসের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যের প্রক্রিয়াজাত গ্লাস উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একই কাঁচামাল ও উৎপাদন অবকাঠামো থেকে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব। আধুনিক ভবন, গ্রিন বিল্ডিং ও জ্বালানি সাশ্রয়ী স্থাপনায় বিশেষায়িত গ্লাসের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে গ্লাস রফতানির পরিমাণ আরো বাড়ানো গেলে সেটি উৎপাদন সক্ষমতা আরো বেশি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করবে।

সব মিলিয়ে দেশের ফ্লোট গ্লাস শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে গত কয়েক বছরে তৈরি হয়েছে বড় উৎপাদন সক্ষমতা, অন্যদিকে নির্মাণ খাতের দুর্বলতায় বাজারের চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। তার ওপর গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, আমদানি ব্যয় এবং তীব্র বাজার প্রতিযোগিতা উৎপাদকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ফ্লোট গ্লাস উৎপাদকদের মুনাফায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; ব্যাংক ঋণের মান ও বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে। তাই নির্মাণ খাতের পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, বিদ্যমান সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহার, মূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন এবং রফতানি বাজার সম্প্রসারণ—এ চারটি বিষয়ই এখন ফ্লোট গ্লাস শিল্পের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং বাজারের পুনরুদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করাই এ খাতের উৎপাদকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও